সহোদর সাউ আর সাউকারি

0
41

সংস্কৃত সহ + উদর= সহোদর। মূলানুগ অর্থে সহোদর মানে একই মায়ের গর্ভজাত ভাই (অমূল্যধন সহোদর রত্ন হইতে যে আমাকে বঞ্চিত করিল- বিষাদ সিন্ধু, মীর মশাররফ হোসেন; দেখিলাম কৃতান্তের সহোদরের ন্যায়, পাপের সারথীর ন্যায়, নরকের দ্বারপালের ন্যায় এক সেনাপতি আসিতেছে- তারাশঙ্কর তর্করত্ন; কর্ণ অর্জুন উভয়ে সহোদর ভাই হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে যখন জাতিভেদ ঘটেছিল, একজন রইল ক্ষত্রিয় আর-একজন হ’ল সূত, তখনি দুই পক্ষে ঘোর বিরোধ বেঁধে গেল- বাংলা শব্দতত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; যাদব মুখুয্যে ও মাধব মুখুয্যে যে সহোদর ছিলেন না, সে কথা নিজেরা ত ভুলিয়াই ছিলেন, বাহিরের লোকও ভুলিয়াছিল- বিন্দুর ছেলে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ঝড় ক্ষণেক কাল গাছপালার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করিয়া সহোদর বৃষ্টিকে ডাকিয়া আনিল- বিষবৃক্ষ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।

কিন্তু মধ্যযুগের বাংলায় শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হতো। কবিকঙ্কণ চণ্ডী সহোদর শব্দটিকে সুসদৃশ অর্থে ব্যবহার করেছেন (তিলফুল জিনি নাসা বসন্ত কোকিল ভাষা ভ্রুযুগল চাপ সহোদর)। আর চণ্ডীদাস নিকটাত্মীয় অর্থে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন (কাহ্ন মোর কুটুম্ব সহোদর)। সহোদরের স্ত্রীলিঙ্গ সহোদরা। এটার অর্থ একই মায়ের গর্ভজাত বোন।

অন্যদিকে সংস্কৃত সাধু শব্দের বিবর্তিত রূপ হচ্ছে সাউ। এটার অর্থ বণিক বা মহাজন। সাউ বিশেষ্য, সাউকারও বিশেষ্য। সাউকার মানে বড় বণিক বা ব্যাপারি। কিন্তু ব্যঙ্গে মাতব্বর বা মুরব্বি অর্থে সাউকার শব্দটির প্রয়োগ রয়েছে।

সাউকারি শব্দটি বাংলায় বিরল। এটার অর্থ সাউকারের কাজ বা মহাজনবৃত্তি (নাও করবা, জাল করবা, সাউকারি কইরা সংসার চালাইবা এই কথা আমার বাপের কাছে তিন সত্য কইরা তবে ত আমারে বিয়া করতে পারছ, স্মরণ হয় না কেন?- তিতাস একটি নদীর নাম, অদ্বৈত মল্লবর্মণ)।

কিন্তু ব্যঙ্গে সাউকারি মানে সাধুগিরি, মাতব্বরি, মুরব্বিয়ানা। আবার সাউখুরি মানে সওদাগরি (সাগর নদীর সাউখুরি করার চেয়ে গলির নর্দমা সাফ করার দিকে আমরা নজর দিতে চাই- প্রেমেন্দ্র মিত্র)।

মনে রাখুন, সাউ, সাউকার ও সাউকারি এর মূল রূপ হচ্ছে যথাক্রমে সাহু, সাহুকার ও সাহুকারি।

সাউ পদবি অর্থেও বাংলায় ব্যবহৃত হয় (রাজলক্ষ্মী কহিল, মন্দির থেকে বেরিয়ে দেখি আমাদের পাটনার লছমন সাউ- শ্রীকান্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।